লক্ষ্য হারাতে নেই

দারিদ্রতা ও অর্থ মানুষের সফলতায় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না।

আজ একটি জ্বলন্ত উদাহরণ দিয়ে আমি আপনাকে এই বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে বোঝাবো। 

ম্যাডাম ক্যুরির নাম অবশ্যই শুনেছেন । ওনার নাম শোনেনি এমন মানুষ খুবই কম রয়েছে এই দুনিয়াতে। 

তেজস্ক্রিয় তা নিয়ে গবেষণা করে সারা বিশ্বের চিত্রটাই বদলে দিয়েছিলেন তিনি । পৃথিবীর ইতিহাসে তিনি একজন একমাত্র ব্যক্তি যিনি দুটি শাখায় নোবেল পুরস্কার লাভ করেছিলেন। সবাই জানে তার কৃতিত্ব কতখানি পদার্থবিজ্ঞান এবং রসায়ন বিজ্ঞানে।

কিন্তু ওনার জীবন সংগ্রামের কথা অনেকেই জানেনা। 

তার ভালোবাসার গল্প, তার বিয়ে , সন্তান, সংসার, আর দুঃখ-যন্ত্রণার গল্প খুব কম মানুষই জানেন। আমি আজ আপনাদের এমন কিছু কথা জানাব এনার বিষয়ে যেগুলি আপনারা কেউই জানেন না বা খুব অল্প মানুষই জানেন।

আশা করি ওনার কথা আপনাকে নিশ্চয়ই অনুপ্রেরণা যোগাবে। 

ম্যাডাম ক্যুরির পুরো নাম মেরি স্কলোডসকা ক্যুরি। ওনার ডাক নাম মানিয়া।

1867 খ্রিস্টাব্দে 7ই নভেম্বর ম্যাডাম ক্যুরির জন্ম হয় পোল্যান্ডের ওয়ারওয়ারসাও শহরে।

পরিবারের সচ্ছলতা ছিল। তিনি ছিলেন সর্বকনিষ্ঠা কন্যা। তাদের বাড়িতে পড়াশোনার একটা সুন্দর রেওয়াজ ছিল। জানা যায় ওনার পিতার প্রতি সন্ধ্যায় সদস্যদের বিজ্ঞান এবং সাহিত্য নিয়ে আসর বসাতেন। ছোটবেলাটা ভালোভাবেই কেটেছিল। খেলাধুলা পড়াশুনা সমস্ত কিছু নিয়ে তার জীবনটা যেন আনন্দে ভরে উঠেছিল সেই ছোট্ট শিশু কন্যাটি বেড়ে উঠছিল তার সমস্ত সুখ স্বাচ্ছন্দ এবং স্বপ্ন নিয়ে যা সে বড় হয়ে পূর্ণ করবে। 

কিন্তু যখন তার দশ বছর বয়স হয় তখন তার মা যক্ষা রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। মায়ের মৃত্যুর পর নেমে আসে তার জীবনে কালোছায়া সে মেনে নিতে পারেনা তার মায়ের এই অকাল মৃত্যু টি এবং সে ভেঙে পড়ে সমস্ত দিক থেকে এবং মনে মনে সেই ছোট্ট বাচ্চা মেয়েটি নিজেকে একা করে নেয়। 

এবং কিছুদিন পর তার বোনটিও জ্বরে আক্রান্ত হয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে। মা এবং বোনকে হারানোর পর সে নিজেকে পুরোপুরি একা করে নেয় । মায়ের মৃত্যুর শোক এবং বোনের সেই হাসিটি সে খুব মনে করত এবং নিজেকে সে বোঝাত যে এই জীবনে একা হয়ে গেছে এবং সে নিজেকে খুবই একা করে নিয়েছিল এই গোটা দুনিয়ার থেকে। 

সেই সময় দেশের রাজনৈতিক অবস্থা ক্রমশ জটিল হয়ে উঠছিল। পুলিশ চেতনার ললিলের জন্য তৎকালীন সরকার মেরির বাবাকে পূর্বের চাকরি থেকে বিনা নোটিশে তাড়িয়ে দিলেন। হলে পরিবারে নেমে আসে আর্থিক সংকট। ছেলে মেয়েদের পড়াশোনা বন্ধ হওয়ার উপক্রম দেখা দেয়। তিনি বড় স্কুলে ভর্তি হতে পারেননি, কারণ পোল্যান্ডে উচ্চ শিক্ষা দেওয়া বিধি নিষেধ ছিল। কিন্তু তার মধ্যে যে কোয়ালিটি ছিল সেটি ফেটে বেরিয়ে আসতে চাইছিল।

তিনি ও তার বোন পুলিশের একটি ভ্রাম্যমান বিদ্যালয়ে যোগদেন। আর্থিক সঙ্কটে কোনরকম পড়াশোনা চালাতে থাকে। পড়াশোনা চালানোর জন্য লোকের বাড়িতে থালা-বাসনও তিনি মেজেছেন। কিন্তু পড়াশোনা বন্ধ করেননি। এমনকি বোন ও তার পড়াশোনার খরচ চালানোর জন্য 500 রুবেলের বিনিময় এক অভিজাত ও রুশ আইনজীবীর বাড়িতে গভর্নরসের চাকরি পর্যন্ত নেন। 

অতিরিক্ত কষ্ট হলেও তিনি টানা তিন বছর কাজকর্ম করে পড়াশুনা চালিয়ে যান। মেরির পরিবার গরিব ছিল , এরপর তাঁর বিবাহ হয়। 

কিন্তু সেই বিবাহ বেশিদিন টেকেনি তাকে বিবাহ বিচ্ছেদ করতে হয়। তিনি মানসিকভাবে প্রচুর দুঃখ পেয়েছিলেন। এরপর মেরি চাকরি ছেড়ে চলে যাব বহুদূরে। 

 ইতিমধ্যেই মেরির বোন পড়াশোনা উচ্চমাত্রায় শিখে নিয়ে ডাক্তার হন। পূর্ব শর্ত অনুযায়ী এইবার মেরি তার বোনের আর্থিক সাহায্য নিয়ে বিজ্ঞানের উচ্চশিক্ষার জন্য অস্ট্রিয়ার শাসনাধীনে ক্রাকো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যান। 

কিন্তু সেখানে বিজ্ঞান ক্লাসে তিনি যোগ দিতে পারেননি কারণ সেটি মেয়েদের জন্য নয় সমাজের বাধা, গন্ডি তাকে আটকে দেয় কিন্তু রান্না করার বিষয়টিতে তিনি উৎসাহ দেখান এবং তিনি রন্ধন ক্লাসে যোগ দেন। তবে এসব বাধা আমেরিকে তাকে বিজ্ঞানের দিক থেকে আটকে রাখতে পারেনি।

1851 খ্রিস্টাব্দে ফ্রান্সে তিনি চলে যান। 1883 খ্রিস্টাব্দে পদার্থবিজ্ঞানে তাকে ডিগ্রি দেওয়া হয়। এরপর শিল্প নিয়ে গবেষণা শুরু করে তিনি। আরো একটি ডিগ্রী তিনি পেয়ে যান। 

এরপর তাকে আর ফিরে তাকাতে হয়নি এরপর তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শুরু করেন । এবং তিনি হয়ে ওঠে বিশিষ্ট পদার্থবিজ্ঞানী। 

বিজয়ী হন তিনি নিজের লক্ষ্যে এবং তিনি প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম মহিলা অধ্যাপক ছিলেন। 

বিজ্ঞান জগতের এই অতুলনীয় নারী যার কৃতিত্বের কথা লিখে শেষ করা যাবে না। তিনি দুবার নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন। তিনি আমাদের জীবনের অনুপ্রেরণা শুধু নয় তিনি হলেন নারীদের গর্ভ এবং তিনি যা করেছেন যে পরিমাণে লড়াই করেছেন নিজের স্বপ্নকে পূরণ করার জন্য তা সত্যিই অসাধারণ।

1934 খ্রিস্টাব্দে মাত্র 66 বছর বয়সে তিনি মারা যান। তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন, কিন্তু তার গবেষণা রসায়নবিদ্যা এবং পদার্থবিদ্যায় জায়গা করে নিয়েছে। 

তিনি কোনো অবস্থাতেই তার লক্ষ্য কে পেছনে ফেলে চলে আসেনি, এগিয়ে গেছেন তার স্বপ্নের দিকে সেটিকে সত্যি করার জন্য অনেক লড়াই করেছে নিজের জীবনের সঙ্গে। 

সমস্ত কিছুর ওপরে তিনি তার লক্ষ্য কে তুলে রেখেছিলেন। দরিদ্রতা ওনার কাছ থেকে ওনার স্বপ্নকে কিছুতেই কেড়ে নিতে পারেননি। 

মেরি ক্যুরির এই অসাধারণ যুদ্ধ থেকে আমরা এটাই জানতে পারি যে জীবনে বেঁচে থাকতে গেলে এবং নিজের স্বপ্নকে পূরণ করতে গেলে সেটাকে লক্ষ্য হিসেবে সামনে রেখে এগিয়ে যেতে হবে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *