ডিপ্রেশন বা অবসাদ কি ? লক্ষণ বা উপসর্গ , কি কি কারণে ডিপ্রেশন জীবনে প্রবেশ করে? অবসাদ কাটানোর উপায় .

আমরা সকলেই জীবনে কখনও না কখনও কোনো না কোনো অবসাদে ভুগেছি। কখনও কাজের চাপে , কখনও চাকরি না পেয়ে, কখনও বৈবাহিক জীবনে অশান্তির কারণে, কখনও বা জীবনে উপযুক্ত সঙ্গী না পেয়ে। জীবনে যে কোনও স্তরে যে কোনও কারণে আমাদের ঘিরে ধরতে পারে অবসাদ বা ডিপ্রেশন।কখনও এই অবসাদই ধারণ করে চরম আকার। দীর্ঘদিন ধরে অবসাদে ভুগে মানুষ বেছে নেয় আত্মহত্যার মতো অবাঞ্ছিত রাস্তা। অবসাদ কাটাতে চিকিত্‍সকদের সাহায্য পাওয়া গেলেও নিজেকে নিজে সাহায্য না করলে অবসাদ কাটানো কখনই সম্ভব নয়।

অবসাদ কি
অবসাদ হল একটি সাধারণ মানসিক ভারসাম্যহীনতা, যা মানুষের চিন্তাভাবনা, অনুভূতি, ব্যবহার, সম্পর্ক, কর্মক্ষমতাকে আক্রান্ত করে; শুধু তাই নয় কখনও মানুষকে মৃত্যুর দিকেও ঠেলে দেয় এই ডিপ্রেশন বা অবসাদ।

লক্ষণ বা উপসর্গ :-
অবসাদ দেখা দিলে,
বেশীরভাগ সময় মন খারাপ লাগে ও দুঃখী থাকে।
কোনও কিছুতেই উৎসাহ থাকে না, রোজকার বা কাজ করতে অক্ষম হয়ে যায়, সহজেই ক্লান্ত হয়ে পরে, আগে যে কাজে উৎসাহ বোধ হাত, এখন সেগুলি ভালো না লাগা।
কিছু কেউ বলুক, যদি ভালো বলে না তো ঠিক আছে কিন্তু বিরূপ সমালোচনা করলে টেম্পার লুস করে দেয় বা মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে।
অন্ধকারকে ভয়, কোনো জন্তু, পোকা, পানি, আগুনের ভয় বা অজানা আতঙ্ক। বারবার হাত-পা ধোয়া, স্নান করা, ঘ্যান ঘ্যান করা ইত্যাদি। আবার অহেতুক চিন্তা ও উত্তেজনা, একটুতেই ঘাবড়ে যাওয়া, একটুতেই ভেঙে পড়া।
নিজের জীবন ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নেতিবাচক মনোভাব।
বেশী খাওয়া বা একেবারেই খাবার না খাওয়া।
সব কিছুতেই নিজেকে দোষী মনে করা এবং অতীতের অসফলতার জন্য অন্যকে দায়ী করা; নিজেকে অযোগ্য মনে করা।
কাজ করার ইচ্ছা হয় না। উৎসাহের অভাবে অল্প বয়সেই ক্লান্তি অনুভব করা। কাজ করার ক্ষমতা আছে কিন্তু ইচ্ছার অভাবে কিছুই করতে চায় না। অলসতা যেন গ্রাস করে ফেলছে। এমনকি খেলাধুলা বা পড়াশোনার ক্ষেত্রেও উৎসাহের অভাব হলে বুঝতে হবে ডিপ্রেশন হয়ে আছে।
শরীরের বিভিন্ন স্থানে ব্যথা অনুভব করা, যেমন মাথা ব্যথা, ঘাড়ে যন্ত্রণা বা খিঁচ ধরা।
নিজেকে আঘাত করা বা আত্মহত্যা বা মৃত্যুর চিন্তা করা।

কি কি কারণে ডিপ্রেশন জীবনে প্রবেশ করে?

অপমান বোধ

যদি কোন ব্যক্তি অন্য একজনের কাছ থেকে প্রতিনিয়ত অপমানিত হয় তাহলে যখন তার মনের মধ্যে চরম আঘাত লাগবে তখন সে ডিপ্রেশন এ ভুগবে। এটা দেখা দেয় যারা একটু লাজুক ধরনের মানুষ, যাঁদের আত্মমর্যাদাটা অন্যের কথার উপরে নির্ভর করে, নিজেকে সব সময় অন্য সবার থেকে কম ভাবে, যারা নিজেকে নিয়ে হীনমন্যতায় ভোগে তাঁদের ডিপ্রেশন এ ভোগার প্রবণতা বেশি লক্ষ্য করা যায়।

একাকিত্ব

কোন মানুষ যদি অনেক লোকজন পছন্দ করে, কোলাহল পছন্দ করে, কিন্তু কোন কারণে সে যদি পরে একাকী জীবন যাপন করতে বাধ্য হয় কিংবা অন্য কারো কথায় আঘাত পেয়ে নিজেকে গুটিয়ে নেয় সে তখন নিজেকে অসহায় বোধ করে এবং একাকিত্বের যন্ত্রণা তার মনে অসহ্য হয়ে কাটার মতো বিঁধতে থাকে আর পরবর্তীতে সেটাই ডিপ্রেশন এ পরিণত হয়। কিংবা যারা দিনের পর দিন একা থাকে বিশেষ কারো সঙ্গে মেশে না তারা ও অনেক সময় নিজেকে পৃথিবীর মধ্যে অসহায় ব্যক্তি মনে করে ডিপ্রেশনে ভোগে।

বংশগত কারণ

কিছু কিছু পরিবারে এমন অনেক ব্যক্তি থাকেন যারা তাদের বংশের বোঝা বয়ে ডিপ্রেশন এর শিকার হন। এদের সব বিষয়ে উত্তেজিত হয়ে পড়ার প্রবণতা দেখা দেয়। একটা সহজ সরল কথাও সহজ ভাবে না ভেবে জটিল আকার তৈরি করে, ফলে নার্ভে সব সময় চাপ সৃষ্টি হয়। এভাবে চলতে চলতে একটা সময়ের পরে মনে ডিপ্রেশন বাসা বাঁধে। এমন অনেক পরিবারই আছে যাঁদের বংশে একজন না একজন ডিপ্রেশন এর শিকার হয়।

জীবনে পরিবর্তন এলে

মানুষের জীবন সব সময় এক নিয়মে চলে না।চলতি পথে এমন অনেক সময় আসে যেই সময় টা পুরো জীবনেরই মোড় ঘুরিয়ে দেয়। এই সময়ে যারা নিজেকে সামলাতে জানে তারা অনেক দৃঢ় এগিয়ে যায় কিন্তু যারা এই ধাক্কা সামলাতে না পারে তারা ডিপ্রেশন এ চলে যায়। ধরুন কেউ একজন কোন বড় অফিসে চাকরি করে কোন একটি কারণে তার চাকরিটা চলে গেল। এই সময় তার আগের জীবন যাত্রায় পরিবর্তন আসবে, তার পরিবারের বিলাসিতা বন্ধ হবে, তার চলার ধরন পাল্টে যাবে, ফলে এই সময় সে যদি নিজেকে শক্ত করে না ধরে থাকতে পারে তাহলে তার মনে ডিপ্রেশন আসাটা কেবল সময়ের অপেক্ষা। তাই জীবনে হঠাৎ যদি কোন বড় পরিবর্তন আসে তাহলে তাকে মেনে নিয়ে এগিয়ে যাওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।

অবসাদ কাটানোর উপায়
আমরা সকলেই জীবনে কখনও না কখনও কোনো না কোনো অবসাদে ভুগেছি। কখনও কাজের চাপে , কখনও চাকরি না পেয়ে, কখনও বৈবাহিক জীবনে অশান্তির কারণে, কখনও বা জীবনে উপযুক্ত সঙ্গী না পেয়ে। জীবনে যে কোনও স্তরে যে কোনও কারণে আমাদের ঘিরে ধরতে পারে অবসাদ বা ডিপ্রেশন।কখনও এই অবসাদই ধারণ করে চরম আকার। দীর্ঘদিন ধরে অবসাদে ভুগে মানুষ বেছে নেয় আত্মহত্যার মতো অবাঞ্ছিত রাস্তা। অবসাদ কাটাতে চিকিত্‍সকদের সাহায্য পাওয়া গেলেও নিজেকে নিজে সাহায্য না করলে অবসাদ কাটানো কখনই সম্ভব নয়।
যদি আমরা বুঝতে পারি যে আমাদের অবসাদ বা ডিপ্রেশন ঘিরে ধরেছে তবে কতকগুলি নিয়ম আমাদের মেনে চলতে হবে.


মনযোগী হতে শিখুন- অবসাদে ভুগলে মনে সবসময় ভুলভাল ও অপ্রয়োজনীয় চিন্তা ভাবনা ভিড় করে। এই ধরণের নেগেটিভ চিন্তা অবসাদগ্রস্ত মানুষকে কোনওভাবে সাহায্য তো করতেই পারে না, বরং ঠেলে দেয় আরও গভীর অবসাদের দিকে। নিজের ইন্দ্রিয়কে সজাগ রেখে দৃশ্য, স্পর্শ, শব্দ, স্বাদের ব্যাপারে মনযোগী থাকুন। যদি নিজেকে কাজের মধ্য ডুবিয়ে দিতে পারেন তাহলে নেগেটিভ চিন্তা মাথায় আসবে না।

গান শুনুন:-অবসাদ কাটানোর জন্য খুব উপযোগী সঙ্গীত। সুর মানুষের হৃদয়কে নড়িয়ে দেয়. তবে দুঃখের গান নয়, এমন গান শুনুন যা মনকে শান্তি দেবে, খুশি রাখবে আপনাকে। পজিটিভ গান চালালে চারপাশটাই পজিটিভ এনার্জিতে ভরে উঠবে।

নেগেটিভ কথা বলা বন্ধ করুন:-অবসাদে ডুবে থাকা মানুষ নিজের চারপাশে সবসময়ই হতাশা দেখে। কথাবার্তার মধ্যেও ফুটে ওঠে নেগেটিভ চিন্তাভাবনা। নিজের সম্পর্কে সংশয়, নিজেকে মূল্যহীন ভাবেন অবসাদে ভোগা মানুষ। এইসময় মানুষ খারাপ কিছু ঘটলে নিজেকে দোষ দেয়, ভাল কিছু ঘটলে ভাগ্যকে ধন্যবাদ জানায়। এটা ঠিক না। মন থেকে নেগেটিভ চিন্তা, নেগেটিভ কথাবার্তা থেকে দূর করুন । অতিরিক্ত ক্ষোভ, অপ্রয়োজনীয় জিনিস নিয়ে ভাবা ও প্রয়োজনের থেকে বেশি চিন্তা করা থেকে নিজেকে দূরে রাখুন। এইসব ক্ষোভ, ভাবনা চিন্তাই আপনার সবথেকে বড় শত্রু। এরাই আপনাকে অবসাদের গভীরে নিয়ে যায়।

ভাল করে ঘুমোন:-অবসাদে ভুগলে মানুষের ঘুম চলে যায় যায়। সবসময় অস্বস্তি ও মানসিক চাপের কারণে টানা ঘুম হয় না। কিন্তু শারীরিক বা মানসিক সুস্থতার জন্য ভাল ঘুম খুব জরুরী। ভাল ঘুমের জন্য কোনো মাসিক শুনতে পারেন. ঘুম ভালো আসার উপায় নিয়ে ভিডিও তৈরী করে নিচে লিংক দিয়ে দেব.

এ ছাড়াও অবসাদ কাটানোর জন্য যে যে বিষয় খুব জরুরি –

  • নৈতিকতার মাধ্যমে যেন আনন্দে থাকা যায় সেদিকে নজর রাখতে হবে।
  • সুখ আর দুঃখ কোনোটাই চিরস্থায়ী নয়. সুখ-দুঃখ টাকার এপিঠ আর ওপিঠ। দুটোকে মেনে নিতে হবে।
  • যেখানে খুশি হারিয়ে যায় সেখান থেকে খুশির পথ খুঁজে নিতে হবে।
  • চিন্তার পরিবর্তন করতে হবে। খারাপ, ব্যর্থ, নেতিবাচক, অহেতুক চিন্তা থেকে মুক্ত থাকার ব্যবস্থা নিতে হবে। তার জন্য আপনি কথা বলুন, শান্ত থাকুন, অন্যকে নয় নিজেকে বদলান।
  • আমাদের মধ্যে যেমন অনেক গুণ আছে তেমনি ত্রুটিও আছে অনেক। ত্রুটিগুলোকে স্মরণ করে সেখান থেকে মুক্ত থাকাই অবসাদ থেকে বেরোনোর পথ।
  • নিজের কাউন্সেলিং নিজে করা দরকার। বিশেষ করে রাতে শোয়ার আগে, সারা দিনের অ্যাকাউন্ট চেক করা এবং পরের দিন পুনরাবৃত্তি যেন না হয় তার প্রতি লক্ষ্য রেখে নতুনভাবে শুরু করা দরকার।
  • কেউ আমাকে বিরক্ত করলে কেন বিরক্ত হব? আমি পারমিশন দিচ্ছি কেন? কারণ মন দুর্বল তাই। মনকে শক্তিশালী করে গড়ে তোলা দরকার।
  • আমি যা আমি তাই। মেনে নিতে হয়। লক্ষ্য মহৎ হলে সফলতা আসবেই। ধৈর্য ও সহনশীলতার কবচ সঙ্গে থাকলে জয় হবেই হবে। এক্সপেক্ট ও রিজেন্ট এই অঙ্ক জানা থাকলে ডিপ্রেশন আসবে না।
  • তরুণ-তরুণীরা মাথাকে যত ব্যবহার করবে ততই ভালো থাকবে।
  • যত সিম্পল হওয়া যাবে ততই ডিপ্রেশন মুক্ত থাকা যাবে। অসম্ভব কথাটা আমাদের অভিধানে থাকতে নেই।
  • নৈতিকতা ও মূল্যবোধকে সঙ্গে নিয়ে চললে ডিপ্রেশনকে প্রতিহত করা যাবে।
  • ভুলে যাও, ক্ষমা করো এই দুটো শব্দ ডিপ্রেশন মুক্ত জীবনের চাবিকাঠি।
  • বাহ্যিক সুখ ক্ষণস্থায়ী, সেই জন্য এই সুখে লালায়িত না-হয়ে আন্তরিক সুখের সন্ধানে নিয়োজিত থাকা দরকার।
  • ক্রোধ থেকে মুক্ত থাকা দরকার।

এই ভাবে আপনি নিজের অবসাদকে নিজেই কাটিয়ে একটি সুন্দর জীবন পেতে পারেন.

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *